প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় প্রবাসে কাটিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গভীরভাবে প্রোথিত দেশের ইতিহাসে। তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপি। মা খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে দলটি।
ওয়ান-ইলেভেন থেকে নির্বাসন
২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’-পরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ওই সময় অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয় এবং শুরু হয় দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার অধ্যায়।

পরবর্তী ১৭ বছর বিএনপির জন্য ছিল কঠিন সময়। দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নিখোঁজের অভিযোগ—সবকিছুর মধ্যেই লন্ডন থেকে দলীয় কর্মকৌশল নির্ধারণ ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেন তারেক রহমান। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচনী সাফল্য
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে শোকাহত করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দলকে সংগঠিত করে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নামেন তিনি।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। আজ তিনি দেশের ১৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’—এই স্লোগান সামনে রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন ও নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। সারাদেশে ধারাবাহিক জনসভা ও তৃণমূল সংগঠনকে সক্রিয় করার মাধ্যমে তিনি জনমত গড়ে তোলেন।
শৈশব, শিক্ষা ও রাজনৈতিক যাত্রা
১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। পড়াশোনা করেন ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে; পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। তবে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ায় পড়াশোনা শেষ করা হয়নি।
১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ২০০২ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।
ব্যক্তিজীবন
১৯৯৪ সালে তিনি বিয়ে করেন ডা. জোবাইদা রহমানকে, যিনি প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা। তাদের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাসন এবং প্রতিকূলতার পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের উত্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গত তিন দশকের দ্বিমেরুকৃত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

আজকের শপথের মধ্য দিয়ে শুধু একটি নতুন সরকারের যাত্রাই শুরু হচ্ছে না; বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটছে।