সভ্যতার উত্থানের প্রথম যুগ থেকেই মানবজীবনে জাদুবিদ্যা ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। গুহামানবের সময় থেকে শুরু করে মিশর, মায়া ও মেসোপটেমিয়ার মতো প্রাচীন উচ্চতর সভ্যতাতেও জাদুবিদ্যা, ঝাড়ফুঁক ও অতিপ্রাকৃত আচার ছিল সমাজজীবন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ধারার সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও নানামাত্রিক চর্চা দেখা যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়—বিশেষত সুমেরীয় ও অ্যাসিরীয় আমলে।
মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতাই প্রথম লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তাদের কিউনিফর্ম মৃত্তিকা ফলকে লিপিবদ্ধ আছে বিশ্বের প্রাচীনতম মহাকাব্য গিলগামেশ, সৃষ্টি কাহিনি এনুমা এলিশ এবং মহাপ্লাবনের গল্প। এসব পাণ্ডুলিপিতে উঠে এসেছে সেই সময়কার জাদুবিদ্যার মন্ত্র, আচার, ভেষজ চিকিৎসা, ভবিষ্যদ্বাণী পদ্ধতি এবং অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির নানা উপায়।
মাকলু: ‘ভস্মীকরণ’-এর মাধ্যমে অশুভ নিবারণ
মাকলু শব্দের অর্থ ‘ভস্মীভূত করা’। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে রচিত নয়টি মৃত্তিকা ফলকের এই পাণ্ডুলিপিতে প্রায় ১০০টি মন্ত্র ও অশুভ জাদু প্রতিরোধের নির্দেশনা রয়েছে। বিশ্বাস করা হতো, কোনো ডাকিনী বা জাদুকর যদি কালো জাদু প্রয়োগ করে, তবে তার প্রতিকৃতি পুড়িয়ে অশুভ প্রভাব দূর করা সম্ভব। প্রথম আটটি ফলকে মন্ত্রসমূহ এবং নবম ফলকে পুরো আচার পালনের নিয়ম লিপিবদ্ধ ছিল।

মেসোপটেমীয় সমাজে অবৈধ ও গোপন কালোজাদুর পাশাপাশি ‘বৈধ’ এবং সামাজিকভাবে অনুমোদিত বিভিন্ন আচারও প্রকাশ্যে পালিত হতো। অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা এবং দেবতাদের বোঝানো যে তারা ভুল ব্যক্তিকে সমর্থন করেছেন—মাকলুর এই আচার সে উদ্দেশ্যেই পালিত হতো।
ডাকিনীবিদ্যা ও দেবতার ভূমিকা
মেসোপটেমীয়দের বিশ্বাস ছিল—দেবতারা সব জানেন, তাই জাদুকরের নাম গোপন রেখে শুধু দেবতাদের উদ্দেশ্যে মন্ত্র উচ্চারণই যথেষ্ট। তাদের মতে, কালোজাদুর মূল উদ্দেশ্য ছিল কারও ব্যক্তিগত ক্ষতি সাধন, আর ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে সেই ক্ষতি প্রতিরোধ করা হচ্ছে দেবতাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
ভবিষ্যদ্বাণী: দুর্যোগ এড়ানোর প্রস্তুতি
প্রায় টিকে থাকা আক্কাদীয় কিউনিফর্ম নথির ৩০ শতাংশই জাদুবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ক। তবে এসবের বড় অংশই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস, যা মেসোপটেমীয় সমাজে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় ব্যবহৃত হতো।
এনুমা আনু এনলিল-এ রয়েছে প্রায় ৭০০০ আকাশ-সংক্রান্ত পূর্বাভাস। আর সুমা আলু ইনা মেলে সাকিন-এ প্রায় ১০ হাজার পূর্বাভাস লিপিবদ্ধ—এটিই এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে বড় ভবিষ্যদ্বাণীসমগ্র।

অঙ্গহীন শিশু জন্ম বা অদ্ভুত প্রাণীর আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে সুমা ইবজু-তে বিভিন্ন শুভ–অশুভ পূর্বাভাস লিপিবদ্ধ আছে। মানবদেহের অঙ্গবিকৃতি ডানদিকে হলে অশুভ, বাঁ দিকে হলে শুভ—এমন ধারণাও প্রচলিত ছিল।
পেশাদার জাদুকর ও রাজসভায় তাদের প্রভাব
অনেকেই মেসোপটেমিয়ায় জাদুবিদ্যাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করত। ঝাড়ফুঁক, চিকিৎসা বা ভবিষ্যদ্বাণী—যে কোনো একটি ক্ষেত্রে তারা দক্ষতা অর্জন করত। আশিপু নামে পরিচিত এই পেশাদার জাদুকরেরা মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার থেকে শুরু করে রাজসভায় পরামর্শদান পর্যন্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। বারু নামে পরিচিত দৈবজ্ঞরা দেবতাদের থেকে পাওয়া লক্ষণ লিপিবদ্ধ করে রাজাকে নিয়মিত প্রতিবেদন দিতেন।
দৈনন্দিন জীবনে জাদুর ব্যবহার
মেসোপটেমীয়দের ঘরবাড়ির গোপন কোণে পাওয়া বিভিন্ন দেবতা ও পৌরাণিক প্রাণীর মূর্তি প্রমাণ করে যে অশুভ শক্তি প্রতিরোধে জাদু তাদের জীবনের দৈনন্দিন অংশ ছিল। পাথরের তাবিজ, রক্ষাকবচ, দেবতার মূর্তি—সবই ব্যবহৃত হতো রোগ, দুর্ভিক্ষ ও দুষ্ট আত্মা থেকে রক্ষার জন্য।
‘লামাসু’—মানুষের মাথা, সিংহের দেহ ও ডানাওয়ালা দেবতার বিশাল মূর্তি রাজপ্রাসাদের প্রবেশপথে স্থাপন করা হতো অশুভ শক্তিকে ঠেকাতে।
কুখ্যাত দেবী লামাশতুকে মনে করা হতো গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের শত্রু। তার হাত থেকে রক্ষার জন্য নারীরা বিশেষ রক্ষাকবচ পরতেন।
দেবতা পাজুজুকে বিশ্বাস করা হতো দুর্ভিক্ষ ও খরার প্রবক্তা হিসেবে। আবার তিনিই ছিলেন রোগ-শোকমুক্তির প্রতীক—একদিকে ভয়, অন্যদিকে ভরসা।

বিশ্বাসের শিকড়
বর্তমান সময়ে প্রাচীন এসব ঝাড়ফুঁক ও মন্ত্রকে অনেকে কুসংস্কার মনে করলেও পাঁচ হাজার বছর আগে চিকিৎসাবিদ্যা সীমিত থাকায় এসব আচার মানুষের মনে নিরাপত্তা ও সান্ত্বনা দিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও মেসোপটেমীয়রা বিশ্বাস করত—মানুষের অজানা ভয়, রোগ ও দুঃসময়ে জাদুবিদ্যাই তাদের একমাত্র আশ্রয়।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়া তাই শুধু সভ্যতার সূতিকাগারই নয়, মানবজাতির জাদুবিশ্বাসেরও এক সমৃদ্ধ ও রহস্যময় ইতিহাস।