টেলিভিশনের ইতিহাসে এক অনন্য কালচারাল ফেনোমেনন ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’। সাধারণত কোনো অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারে না—ভাটা পড়ে দর্শক টানতে। কিন্তু এ তত্ত্বকে অগ্রাহ্য করে বেয়ার গ্রিলস প্রায় পাঁচ বছর ধরে তার দুঃসাহসিক অভিযান দিয়ে মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন সব বয়সের দর্শককে। অদ্ভুত সব প্রাণী ভক্ষণ থেকে শুরু করে মৃত্যুঝুঁকির পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল—সবই যেন তার নিত্যসঙ্গী।
বেয়ার গ্রিলস: অ্যাডভেঞ্চারের অগ্নিপরীক্ষা
‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ বোঝার আগে জানতে হয় এর প্রাণপুরুষ এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলসকে—যাকে বিশ্ব চেনে বেয়ার গ্রিলস নামে। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বেয়ারের পরিবারেই ছিল খেলাধুলা ও অভিযানের ছোঁয়া। ছোটবেলা থেকেই পিতার প্রভাবে অভ্যস্ত হন অ্যাডভেঞ্চারের জগতে, হাতেখড়ি স্কাই ডাইভিংয়ে।
তার ডাকনামের উৎসও মজার—জন্মের অল্প কিছুদিন পর বড়বোন লারা ফসেট তাকে ‘বিয়ার’ বলে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তার পরিচয় হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ‘২১ SAS Regiment’-এর প্যারাট্রুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না তিনি। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে গিয়ে শুরু করেন এভারেস্ট জয়ের প্রস্তুতি। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১৬ মে জয় করেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরটি।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা পান তিনি—রয়্যাল ন্যাভাল রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (২০০৪), রয়্যাল মেরিন রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কর্নেল (২০১৩) এবং ব্রিটিশ আর্মির কর্নেল (২০২১) উপাধি।
শোয়ের উত্থান
ডিসকভারি চ্যানেল প্রথম পাইলট এপিসোড ‘দ্য রকিজ’ প্রচার করে ২০০৬ সালের ৬ মার্চ। পরবর্তী এপিসোড আসতে সময় লাগে দীর্ঘ আট মাস। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মোট সাত সিজনে প্রচারিত হয় ৭৩টি এপিসোড।
যদিও দর্শকের মনে ধারণা—বেয়ারকে সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। প্রতিটি এপিসোড নির্মাণে সময় লাগত প্রায় ১০-১২ দিন। জায়গা নির্বাচন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বেয়ার গ্রিলসের চলার পথ প্রস্তুত করতে বিশেষজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গ দল কাজ করত পর্দার আড়ালে।
নেপথ্যের বিতর্ক
শো-টিকে বাস্তবধর্মী মনে হলেও কিছু দৃশ্য ছিল পরিকল্পিত। কিছু ক্ষেত্রে বেয়ার নাকি হোটেলে রাত কাটাতেন—এমন অভিযোগও ওঠে। এমনকি আগ্নেয়গিরি বিষয়ক এক পর্বে নকল ধোঁয়া ব্যবহার করা হয়েছিল। এক এপিসোডে ব্যবহৃত হয়েছিল নকল ভালুকের স্যুটও।

এসব বিতর্কের পর ডিসকভারি চ্যানেল শোয়ের শুরুতে ‘ডিসক্লেমার’ যুক্ত করতে বাধ্য হয়—যেখানে স্পষ্ট করা হয়, বেয়ার একা নন; তার সঙ্গে থাকে একটি বিশেষজ্ঞ দল। চতুর্থ সিজনে বেশ কিছু বিহাইন্ড-দ্য-সিন ফুটেজ প্রকাশ করা হয় অনলাইনে।
‘বিকৃত পরিবেশে খাবার’—বেয়ারের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
শোয়ের অন্যতম আকর্ষণ বেয়ারের অদ্ভুত সব প্রাণী ভক্ষণ। বিচ্ছু, পচা মাংস, ভালুকের মল, বিষধর সাপ এমনকি নিজের মূত্র—কিছুই বাদ যায় না। তবে বেয়ারের মতে, তার জীবনে খাওয়া সবচেয়ে জঘন্য খাবার ছিল ছাগলের অণ্ডকোষ—যা খেয়ে তিনি বমিও করেছিলেন। অথচ আরবের যাযাবর জনগোষ্ঠীর কাছে এটি দৈনন্দিন খাবার।
ভয়হীন বেয়ারের ভয়
দুঃসাহসিকতার প্রতীক হলেও বেয়ার গ্রিলসেরও ভয় আছে—আর তা হলো উচ্চতা। পর্দায় বারবার এই ভয়কে জয় করতে দেখা গেলেও ব্যক্তিগতভাবে এটি তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
শোয়ের নাম ভেদে জনপ্রিয়তা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ নামেই শোটি পরিচিত হলেও যুক্তরাজ্যে এটি প্রচারিত হয় ‘Born Survivor’ নামে। আবার কিছু দেশে নাম হয় ‘Ultimate Survival’।

ডিসকভারি পরবর্তী যাত্রা
২০১২ সালে ডিসকভারির সঙ্গে বেয়ারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তবু তারা তাকে সহজে ছাড়েনি। পরবর্তী সময়ে বেয়ার উপহার দেন Worst Case Scenario, Get Out Alive, Escape from Hell, The Island, Running Wild with Bear Grylls—এর মতো শো।
২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তিনি তৈরি করেন ইন্টারঅ্যাকটিভ শো ‘You vs Wild’, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে।