জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টার পেছনে কোটি টাকার একটি সুপরিকল্পিত ‘মিশন’ কাজ করেছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে উঠে এসেছে, মোহাম্মদপুরের এক সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছে—অর্থ জোগান, অস্ত্র সরবরাহ, হামলার পর পালানোর ব্যবস্থা, যানবাহন প্রস্তুত, নম্বর প্লেট পরিবর্তন ও সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সহায়তাসহ সবই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান, তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ এবং গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, এ ধরনের আরও শুটার গ্রুপ সক্রিয় থাকতে পারে—এ আশঙ্কায় গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, হাদিকে হত্যার লক্ষ্যে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। শুটার ফয়সালের বাসা থেকে উদ্ধার করা একাধিক চেকে তার স্বাক্ষর পাওয়া গেছে—যেগুলো মিশনের অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা যাচাই চলছে।
র্যাব রাজধানীর আগারগাঁওয়ের কর্নেল গলিতে ফয়সালের বোনের বাসার নিচ থেকে হামলায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের দুটি ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এছাড়া নরসিংদীর সদর উপজেলার তরুয়া এলাকায় একটি বিল থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, একটি খেলনা পিস্তল ও ৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৩ ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির ও মা মোসাম্মাৎ হাসি বেগমকে গ্রেপ্তার করে পরে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত র্যাব ও পুলিশ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের কথিত মালিক আবদুল হান্নান, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও, ফয়সালের সহযোগী ও মোটরসাইকেলের মালিক মো. কবির, এবং ফয়সালের বাবা-মা। কয়েকজন সন্দেহভাজন সহযোগী এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে।

রিমান্ডে জানা গেছে, হামলার বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন কথিত বান্ধবী মারিয়া। ঘটনার আগের রাতে ফয়সাল ও আলমগীর সাভারের একটি রিসোর্টে অবস্থান করেন; সেখানে মারিয়াও ছিলেন। ওই রাতে ফয়সাল বলেন, “কাল এমন কিছু হবে, সারা দেশ কাঁপবে।” পরদিন সকালে তারা ঢাকায় ফেরেন।
হামলার দিন ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট ছিল ভুয়া। ঘটনার পর আগারগাঁওয়ে ফয়সালের বোনের বাসায় গিয়ে আসল নম্বর প্লেট লাগানো হয় এবং পালানোর জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। স্ত্রী সামিয়ার মাধ্যমে বিকাশে ফয়সালের কাছে টাকা পাঠানোর তথ্যও মিলেছে।
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে সীমান্তমুখী যাত্রায় ব্যবহৃত প্রাইভেট কারের চালক বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে; আরেক চালক নজরদারিতে রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে অর্থায়ন ও পলাতক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য মিলবে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার মো. কবিরকে আদালত সাত দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন। তদন্তে বলা হয়েছে, তার মোটরসাইকেল ব্যবহার করেই হত্যাচেষ্টার মিশন চালানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, কবির অস্ত্র সরবরাহ ও পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন।
গত শুক্রবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। ঢামেকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের করা হত্যাচেষ্টা মামলাটি ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কার কী ভূমিকা এবং নেপথ্যের অর্থায়নকারীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।