১৬ বছর আগের পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসকে হত্যাকাণ্ডের ‘প্রধান সমন্বয়ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এল এম ফজলুর রহমান ও সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে কমিশনের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

২০০৯ সালের ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জন নিহত হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন তোলে এ ঘটনা। দেড় দশক পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দাবি ওঠে পুনঃতদন্তের, যার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।
কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের বিদেশে চলে যাওয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। তিনি জানান, সাক্ষীদের দীর্ঘ সময় শুনানির পাশাপাশি আগের তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিশনের সদস্য জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার জানান, হত্যাকাণ্ডটি ‘পরিকল্পিত’ এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু ব্যক্তি জড়িতদের রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মিছিল নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ এবং পরে বের হওয়ার সময় মিছিলের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ ছিল—এমন তথ্যও কমিশন পেয়েছে। দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপরও বর্তায়।
এছাড়া ঘটনাকালে কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের ‘অপেশাদার আচরণ’-এর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন হাতে পেয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন অন্ধকারে ছিল। সত্য উদ্ঘাটনে কমিশনের ভূমিকা জাতি স্মরণে রাখবে।” তিনি আরও বলেন, এ প্রতিবেদন জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।

ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এমন ঘটনা এড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন বেশ কিছু সুপারিশও করেছে।
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সদস্যরা হলেন—
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার,
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক,
সাবেক যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ,
সাবেক ডিআইজি এম. আকবর আলী,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম,
ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।