বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় বহু বছর ধরেই শীর্ষস্থান দখল করে আছে অ্যাপল। ফোর্বসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩.০২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন নিয়ে অ্যাপল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি। ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করার পর প্রথম ট্রিলিয়নে যেতে কোম্পানির সময় লেগেছে ৪২ বছর, কিন্তু এরপর মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তারা ছুঁয়েছে অভাবনীয় ৩ ট্রিলিয়নের মাইলফলক।
তবে অ্যাপলের পথচলা যে শুধু সাফল্যের গল্প—তা নয়। বাজারে একের পর এক জনপ্রিয় পণ্য এনে বিশ্বকে চমকে দিলেও, কিছু পণ্য অ্যাপলকে দিয়েছে তিক্ত ব্যর্থতার স্বাদ। সেই ব্যর্থতার তালিকা থেকেই বাছাই করা অ্যাপলের দশটি ব্যর্থ প্রোডাক্ট তুলে ধরা হলো নিচে।
১. Apple III — অ্যাপলের প্রথম ব্যর্থতা
১৯৮০ সালে Apple II–এর উত্তরসূরি হিসেবে বাজারে আসে Apple III। কিন্তু কুলিং সিস্টেমের ঘাটতির কারণে অল্প সময় ব্যবহারেই যন্ত্রটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যেত। সার্কিট বোর্ড নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে সকেট থেকে চিপ খুলে যাওয়া—সব মিলিয়ে ডিভাইসটি সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে অ্যাপল বাজার থেকে তুলে নেয় প্রায় ১৪ হাজার ইউনিট Apple III।

২. Apple Lisa — উচ্চমূল্য আর ধীরগতির হতাশা
১৯৮০-এর দশকে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসযুক্ত পার্সোনাল কম্পিউটার খুবই বিরল ছিল। সেই সুবিধা দিয়েই বাজারে আসে Apple Lisa। দাম ছিল প্রায় ১০ হাজার ডলার। কিন্তু উচ্চমূল্য, ধীরগতির পারফরম্যান্স এবং জটিল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা Lisa-কে ব্যর্থ করে তোলে। শেষমেশ অ্যাপল পুরনো Lisa ফেরত দিয়ে কম মূল্যে Macintosh Plus কেনার সুযোগ দেয় ব্যবহারকারীদের।
৩. Macintosh Portable — ‘পোর্টেবল’ নামের ভারী বোঝা
১৯৮৯ সালে অ্যাপল প্রথম ব্যাটারিচালিত ল্যাপটপ চালু করে—Macintosh Portable। কিন্তু পোর্টেবল নাম হলেও ওজন ছিল প্রায় ৭ কেজি। ব্যাটারির জটিলতা এবং অনিয়মিত পাওয়ার সাপ্লাইয়ের কারণে ডিভাইসটি দ্রুতই গ্রাহকদের হতাশ করে। দুই বছরের মাথায় বাজার থেকে উঠে যায় এই ব্যর্থ ল্যাপটপ।
৪. Copland — অপারেটিং সিস্টেম সংস্কারে ব্যর্থতা
ম্যাকিন্টোশ সিস্টেম যুগে পরিবর্তন আনতে অ্যাপল ১৯৯০-এর দশকে শুরু করে Copland প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল এমন একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা, যা একদিকে উইন্ডোজ অ্যাপ চালাতে পারবে, অন্যদিকে মাইক্রোসফটের সঙ্গে টক্কর দিতে সক্ষম হবে। তবে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
৫. Apple Pippin — গেমিং কনসোলে অ্যাপলের বিপর্যয়
সনি, নিন্টেন্ডো ও সেগার আধিপত্যে গেমিং জগত ছিল জমজমাট। সেই বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসে Apple Pippin। দাম ছিল ৬০০ ডলার—যেখানে Nintendo 64 পাওয়া যেত মাত্র ২০০ ডলারে। উচ্চমূল্য, অল্পসংখ্যক গেম এবং সীমিত গ্রহণযোগ্যতার কারণে এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে হারিয়ে যায় Pippin।

৬. Apple Newton — বিপ্লবের স্বপ্নে ব্যর্থতা
১৯৮৭ সালে অ্যাপল Newton বাজারে আনে PDA (Personal Digital Assistant) জগতে প্রবেশের লক্ষ্যে। বিশেষত্ব ছিল—হাতের লেখা টেক্সটে রূপান্তর করার ক্ষমতা। কিন্তু সফটওয়্যারের ভুল শনাক্তকরণ এবং দুর্বল পারফরম্যান্স Newton-কে অ্যাপলের অন্যতম ব্যর্থ উদ্ভাবন হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

৭. Apple eMate — সীমিত বাজারই কাল হলো
Apple eMate ছিল পামটপ ও ল্যাপটপের এক হাইব্রিড সংস্করণ, নিউটন OS-এ চালিত। দামও ছিল তুলনামূলক কম—৭৯৯ ডলার। কিন্তু এটি শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট হওয়ায় বড় বাজার হারায়। ফলে মুক্তির মাত্র ১১ মাসের মধ্যেই পণ্যটি তুলে নিতে বাধ্য হয় অ্যাপল।

৮. 20th Anniversary Macintosh — আড়ম্বরই শেষ পর্যন্ত ক্ষতি
অ্যাপলের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ ডিজাইনের এই ম্যাকিন্টোশ মডেলে ছিল এলসিডি ডিসপ্লে, টিভি টিউনার, বোস সাউন্ড সিস্টেমসহ নানা বৈশিষ্ট্য। তবে এর দাম ছিল বিপুল—৭,৫০০ ডলার। উচ্চমূল্যের কারণে মাত্র ১২ হাজার ইউনিট উৎপাদন করেও অ্যাপল তা বিক্রি করতে হিমশিম খায়। পরে দাম কমিয়ে ২,০০০ ডলারে এনে স্টক শেষ করতে হয়।

৯. G4 Cube — সুন্দর ডিজাইনে লুকানো সীমাবদ্ধতা
২০০১ সালে অ্যাপল বাজারে আনে আড়ম্বরপূর্ণ ডিজাইনের G4 Cube। কিন্তু ১,৭৯৯ ডলারের এই কম্পিউটারে মনিটর দেওয়া হয়নি। যেখানে ২০০ ডলারের মধ্যেই পাওয়ার ম্যাক G4 ছিল—সেখানে Cube ক্রয়ের আগ্রহ কমে যাওয়া স্বাভাবিকই ছিল। ফলে এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে চুপিসারে হারিয়ে যায় পণ্যটি।
১০. Air Power Wireless Charger — ঘোষণার পরেই বাতিল
২০১৭ সালে অ্যাপল ঘোষণা দেয় Air Power চার্জিং ম্যাটের—যা একইসঙ্গে আইফোন, এয়ারপডস এবং অ্যাপল ওয়াচ চার্জ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু উৎপাদনগত নানা জটিলতা কাটিয়ে পণ্যটি বাজারে আনতে না পারায় ২০১৮ সালেই প্রজেক্টটি বাতিল করে অ্যাপল।
প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষে অবস্থান করলেও অ্যাপলের যাত্রা সবসময় সাফল্যমণ্ডিত ছিল না। ব্যর্থতার এই অধ্যায়গুলোই প্রমাণ করে, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া উদ্ভাবনের পথ তৈরি হয় না। ব্যর্থতাকে সোপান করেই আজ বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্যবান কোম্পানির শীর্ষে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাপল।