সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নতুন মোড় নিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–এর কূটনৈতিক সম্পর্ক। ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি সংশোধিত শান্তি প্রস্তাব ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা ও জল্পনা।
গত শুক্রবার এই প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসে এবং একই দিনেই এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে পরবর্তীতে তিনি জানান, প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনা করা হবে। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হবে, যদিও এটি গ্রহণযোগ্য হবে কিনা—তা নিয়ে তিনি সংশয়ে আছেন।
ইরানের এই নতুন প্রস্তাবটি আসলে আগের একটি প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ। যদিও প্রস্তাবটির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, তবে রয়টার্স-কে দেওয়া এক ইরানি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে—ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হামলা চালাবে না, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। এই শর্তগুলোর ভিত্তিতে প্রথমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর পরবর্তী ধাপে আলোচনার বিষয় হবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করা। বিনিময়ে পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, জটিল বিষয়গুলো শেষ ধাপে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে, যাতে আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায়।
লেবাননসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে চলমান সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে। দেশটির দাবি, এটি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ৯ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যার জবাব হিসেবে ইরান এই নতুন পরিকল্পনা দিয়েছে। পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায়।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি বলেন, “স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই আমরা এই পরিকল্পনা জমা দিয়েছি। এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের—তারা কি কূটনীতির পথে হাঁটবে, নাকি সংঘাত বজায় রাখবে।”
এদিকে সময়সীমা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দুই মাস সময় চেয়েছে, সেখানে ইরান চায় সব সমস্যার সমাধান ৩০ দিনের মধ্যেই হোক।
নতুন এই প্রস্তাবে ইরান বেশ কিছু কঠোর শর্তও জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ভবিষ্যতে কোনো সামরিক আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, ইরানের সীমান্ত থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ফেরত দেওয়া।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, “ইরান একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু তারা এমন কিছু দাবি করছে, যা আমি মেনে নিতে পারছি না।” পরে ফ্লোরিডায় এক ভাষণে তিনি আরও বলেন, “আমরা তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না, যাতে কয়েক বছরের মধ্যেই আবার একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই—এই প্রস্তাব কি শান্তির নতুন দ্বার খুলবে, নাকি আরও গভীর সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে বিশ্বকে?